Christianity in Garo Culture

গারো সংস্কৃতিতে  খ্রিষ্টধর্ম

গারো বাংলাদেশের অন্যতম আদিবাসী সম্প্রদায়। তাদের নিজস্ব সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি আছে। খ্রীস্টধর্ম গ্রহণের পূর্বে তারা সাংসারেক বা প্রকৃতি পূজার উপাসনা করত। তারা প্রকৃতির মধ্যে একটা অতিপ্রাকৃতিক এবং অবিশ্বাসী শক্তি আছে বলে তারা বিশ্বাস করত। তবে বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ট গারো খীস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। তারা তাদের প্রাকৃতিক উপাসনা অননুশীলন করছে ঠিকই কিন্তু সংস্কৃতিকে এখনও তারা ধরে রেখেছেন। খ্রীস্ট ধর্ম উদার, সহনশীল এবং গ্রহণীয় মনোভাব বেশী বিধায় গারো সংস্কৃতি তারা খ্রীস্ট ধর্মে চর্চা করতে পারছে এবং একই সাথে খীস্ট ধর্ম চর্চা করছে। সুতরাং গারো সমাজে এবং তাদের সংস্কৃতিতে খ্রীস্ট ধর্মের প্রভাব খুব বেশী লক্ষণীয়। খ্রিস্ট ধর্ম তাদের সংস্কৃতি চর্চা করতে সুযোগ করে দিচ্ছে। বলা যেতে পারে যে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের ফলে তারা শিক্ষিত এবং সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারছে। তা না হলে তাদের সংস্কৃতি বিলুপ্তের পথে। সুতরাং খ্রীস্ট ধর্মের প্রভাব গারো সংস্কৃতিতে আছে।
উৎপত্তির ইতিহাস
গারো জাতির উৎপত্তি এবং আদিভূমি কোথায় এর সঠিক তথ্য নিয়ে সন্দিহান আছে। তাই তাদের বাসভূমি এবং আদিভূমির সঠিক তথ্য জানার জন্য প্রচুর গবেষণা এবং পরিশ্রমের প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখক গারোদের উৎপত্তি ও বাসস্থল সর্¤úকে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। গারোদের অনেকের বিশ্বাস ও কথ্য ভাষ্যানুসারে তাদের পূর্ব পুরুষদের বাসভূমি তিব্বতে। এর পিছনে যুক্তি হল গারোদের কথ্য ভাষা এবং তিব্বতীয় ভাষার মধ্যে অনেকেটা মিল আছে। রূপ কথানুসারে গারো র্পূবপুরুষরা যখন এই দেশে আগমন তখন ‘ইয়াক গাইয়েক’ পুচ্ছ নিয়ে আসেন কেননা এটা ছিল তাদের কাছে পবিত্র ও দামি। গারোদের কিংবদন্তী কাহিনী ও গল্পানুসারে জানা যায় যে গারোরা খ্রীস্ট জন্মের সহস্র বছর পূর্বে এই উপমহাদেশে জাপপা, বাজিদপা, মুখপা, বংগিপা, সুকাংপা, ইলিংপা, দপাপা প্রমুখ নেতৃবৃন্দের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আগমন করে।
গারো সংসারেকদের ধর্মীয় বিশ্বাস
গারো সাংসারেকরা একেশ্বরবাদী। তারা এক সৃষ্টিকর্তার বিশ্বসী। তাদের সৃষ্টিকর্তার নাম ‘তাতারা রাবুগা’। তিনিই বিশ্বভ্রমান্ডকে সৃষ্টি করেছন। তিনিই সৃষ্টি কর্তা । তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিত- পাস্তুরা, স্তুরা, নকমা। তাকে সৃষ্টির কাজে সহায়তা করেছেন অনান্য দেবতাগনণ গারোদের দেবতা নস্তু, নুপাস্তু, মাচি, বারচিং, চিবাং, নকমা, নজারিক নদংদিল, বালপং, গিত্তেল, নোরিচিত কিমরী বোক্রে, গরাংপা, আগপপা, আপিতপা সাালজং আরো অনেক দেবতাগণ। সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, বজ্র ও বৃষ্টি প্রভৃতির মাঝে প্রবল শক্তির উপস্থিতি অনুভব করে তারা তাদের দেবদেবী হিসাবে গ্রহন করেছে এবং তাদের ব্যক্তির রুপ দিয়েছেন। তাদের জন্য ঈশ্বর হলেন ভয়ের, শাস্তির এবং প্রাণ হননের ব্যাক্তি। অন্যদিকে যখন তাদের কাছে ঈশ্বরের বাণী নিয়ে আসলেন তখন তারা ক্ষমাশীল ঈশ্বর. দয়াবান ঈশ্বর এবং সান্নিধ্যের ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। তাই তারা আজানা ঈশ্বর, ক্রোধের ঈশ্বর এবং যে ঈশ্বর শাস্তি দেয় সেই ঈশ্বরকে পরিত্যাগ করে ক্ষমাশীল ঈশ্বরকে গ্রহণ করলেন।
 বর্তমানে ৯৯% গারো আদিবাসী খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। সুতরাং তারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী। যীশু খ্রিস্টের ধর্ম শিক্ষা গ্রহণ করে। যারা ক্যাথলিক তারা পবিত্র আত্মা এবং পবিত্র ত্রিত্বে বিশ্বাস করে। সুতরাং তারা এখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বিশ্বভ্রমান্ডের সৃষ্টি কর্তা এবং রক্ষাকর্তা। তিনি আদি এবং অন্ত্য। তাঁর শেষ এবং শুরু নেই। যীশু খ্রিস্ট হলেন ঈশ্বর পুত্র। যাঁকে ঈশ্বর প্রেরণ করেছেন মানব জাতিকে পাপের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। তারা বিশ্বাস করে যে যীশু ক্রুশে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তৃতীয় দিনে আবার পুনরুত্থান করেছেন এবং স্বর্গে আরোহন করেছেন। সুতরাং তারা এখন মনে প্রাণে খ্রিস্ট ধর্ম র্চচা করছে।
সাংসারেক গারোদের সৃষ্টি কাহিনী
সাংসারেক গারোদের বিশ্বাস  পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে চারিদিকে পানি ছিল। ভূমির চিহ্ন মাত্র ছিল না এবং সবকিছুই অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। তারারা রাবুগা ইচ্ছা করলেন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন কাজেই নন্তু ও নুপান্তুকে আদেশ দিলেন পৃথিবী করার জন্য।  তারা আশ্রয় নিলেন মাকড়সা জাল এবং জলরাশির উপর এবং সেই জাল বিস্তার করলেন। নন্তু নুপান্তুকে তাতারা রাবুগা কিছু বালিও দিয়েছেলেন। অতএব
তারা বালি মুষ্টিবদ্ধ করে পানির নিচে নিক্ষেপ করে বললেন ‘ নীচ থেকে মাটি নিয়ে এসো। আর নিচ থেকে মাটি নিয়ে আসলে সেই মাটি দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। পৃথিবী সৃষ্টি হলে সবকিছু ভিজে রইল তাই তিনি আকাশে সূর্য, চন্দ্র সৃষ্টি করলেন। মর্তে তিনজন দেবতাকে প্রেরণ করলেন। তাদের প্রচেষ্টায় অল্পদিনেই প্রথিবী বাসযোগ্য হল। তারপর তাতারা রাবুগা জীবজন্তু সৃষ্টি করল। তারা ভাবল আবাদের জন্য আবাসভূমি মানবজাতির জন্য প্রয়োজন, তিনি তাই করলেন। রুরুরে কিন্নাসে মানব জাতি সৃষ্টিতে তাতারা রাবুগাকে সহায়তা করে। মানব জাতিকে সৃষ্টি করে আমিতঙে রেখে দিলেন। শান ও মুনি প্রথম মানব জাতি। তাদের সন্তান গাচেং ও দুজং।  নরমান্দে ও দিমা (বানচি) সন্তান। এখান থেকেই গারো জাতির বংশধর। এটা হল তাদের বিশ্বাসানুসারে সৃষ্টির কাহিনী। খ্রিস্টানদের সৃষ্টি কাহিনীর সাথে গারোদের সৃষ্টি কাহিনীর সাথে কিছুটা মিল আছে । খ্রিস্ট ধর্মে ঈশ্বরই সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাঁর কারো সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি। খ্রিস্ট ধর্মে আদি মানব হল আদম ও হবা।
তাদের বিশ্বাসানুসারে স্বর্গ-নরক
গারোদের বিশ্বাস  মৃত্যুর পরে বিদেহী আত্মা প্রথমে বালপাক্রাম পাহারে গমন করে এবং সেখানে সাময়িক বিশ্রাম গ্রহণ করার পর চিকমাং পাহারে গমন করে এবং সেখানে অবস্থানরত ইতোমধ্যে মৃত আত্মীস্বজনদের সাথে সাময়িক বসবাস করতে শুরু করে। পরবর্তীতে তার জাগতিক কর্মানুযায়ি সে মানুষ বা প্রাণী, বৃক্ষলতারুপে পৃথিবীর বুকে পুর্ণজন্ম করবে। আর বিদেহী আত্মা যদি পবিত্র হয় তাহলে পূর্ণজন্ম পরিহার করে অজানা চিরশান্তি অনন্তলোকে যাত্রা করে। গারোদের অনন্তমুখ এবং নরকের শাস্তি সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট ধারণা নাই। খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষায় স্বর্গ, নরক ও মধ্যেস্থানের কথা বলা হয়েছে। গারোদের স্বর্গ নরক বিশ্বাসানুসারে মৃত্যুর পর আত্মা আত্মিয় স্বজনদের সাথে সাময়িক বিশ্রাম করে। কিন্তু খ্রিস্ট ধর্মে মৃত্যুর পর কেউ কারো সাথে পরিচয় থাকবে না। স্বর্গে সবার অধিকার সমান থাকবে। সেখানে কোন ভেদাভেদ থাকবেনা। খ্রিস্ট ধর্মে পূর্ণজন্ম নেই।
ঝুম চাষের সময় উসব অনুষ্ঠান: আগাল মাক্কা বা আচিরকা
ঝুম চাষের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের  জন্য প্রথমে যে অনুষ্ঠানটি করা হয় তাকে গারো ভাষায় আগাল মাক্কা অথবা আচিরকা বলে। বছরের প্রারম্ভেই ফসল বোনার আগে এই অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানটি পালন করা হয়। ঝুম ক্ষেতের গাছপালা ঝোপঝাড় কাটা হয়ে গেলে আগুন দিয়ে পুড়ে পরিষ্কার করার পূর্বে তারা এই আচার অনুষ্ঠানটি করে থাকে। আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ হল আগুনের তাপ দেয়াকে বুঝাই। সর্ব প্রকার পারিবারিক অমঙ্গল যাতে দূর হয় এবং দেবদেবীরা যাতে নিয়মিত বৃষ্টিপাত ঘটায় তার উদ্দেশ্যে গারোরা এ অনুষ্ঠান করে থাকে। পূর্বে যে উপসনার মাধ্যমে পরিবার এবং ফসল বৃদ্ধির জন্যে র্প্রাথনা করতেন এখন সেই স্থানে ঈশ্বরের কাছে সর্বপ্রথম যেকোন ফসল উৎপাদনের কাজের পূর্বে  ঈশ্বরের কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করে যাতে ফসল ভাল ও প্রচুর উৎপাদন হয়। এখন তারা যে কোন আচার অনুষ্ঠানের পূর্বে পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এবং সে র্প্রাথনা পরিচালনা করের খ্রিস্টান পুরোহিত।
রংচুগালা বা নতুন চিড়ার উৎসব
ধান কাটার আগে গারোরা রংচুগাল্লা নামে একটি অনুষ্ঠান করা হয়। এই অনুষ্ঠান রাত্রে করা হয়। ঝুম ক্ষেতের ভাগ্য দেবীর উদ্দেশ্যে নতুন ধানের চিড়া উৎসবের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান করা হয়। ঝুম ক্ষেতের এককোনার জায়গা পরিষ্কার করে নতুন ধানের চিড়া কলা পাতায় দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে নাচ-গানও করা হয়। এই আচার অনুষ্ঠান বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। তবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ি একটা খুবই অর্থপূণ এবং যথাযথ আচার অনুষ্ঠান। আমরা শুরতে ঈশ্বরের নাম নিয়ে শুর করি যাতে যাই করি না কেন ভাল করতে পারি কিন্তু যখন কাজ সম্পন্ন হয় তখন আমরা ঈশ্বকে ধন্যবাদ দিতে ভুলে যায়। আমি মনে করি এই আচার অনুষ্ঠান হল ধন্যবাদের অনুষ্ঠান । ভাল ফসল পাওয়ার জন্য ঈশ্বরের ধন্যবাদ। তাই খ্রিস্ট ধর্মানুসারে ফসল ভাল উৎপাদনের জন্য প্রথমে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারপর ফসল কাটা শুর করতে পারি।
জামে গাপ্পা-আহাওয়া
জামে গাপ্পা হল ঝুম ক্ষেতে ধান কাটার প্রারম্ভিক উৎসব অনুষ্ঠান। এ সময়ে গারো ছেলেরা চিৎকার করে ‘আহাওয়া’ শব্দটি। তাই এই অনুষ্ঠানকে জামে গাপ্পা আহাওয়া বলা হয়। ধান কাটার সময় তারা আনন্দ প্রকাশের জন্য আহাওয়া বলে চিৎকার করে। আহাওয়ার দিন তারিখ ও সময় সমাজের প্রধান ব্যক্তি এবং আখিং নকমা নির্ধারণ করে থাকেন। সবাই এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারে। এই উৎসব  অনুষ্ঠানে ধানের শীষগুচ্ছগুলো উৎসর্গ করা হয় দেবতাদের উদ্দেশ্যে এবং সেগুলো বাড়ি নেয়ার পর ওয়ানগালার জন্য প্রস্তুতিস্বরুপ ঔ ধানের চাল দিয়ে মদ প্রস্তুত করা হয়। এই আচারানুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে ঈশ্বরের ধন্যবাদ, প্রশংসা এবং সামগীত করতে করতে এই ফসল কাটার অনুষ্ঠান করে ঈশ্বরের মহিমান্নিত করতে পারি।
ওয়ানগালা
ঝুম চাষের সাথে সংযুক্ত যে কয়েকটি সামাজিক উৎসব পালন করা হয় তাদের মধ্যে ওয়ানগালা অন্যতম। এই অনুষ্ঠান তারা খুব জাঁকজমক সহকারে করে থাকে। এই সামাজিক অনুষ্ঠান সাতদিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। গারো ওয়ানগালা উৎসব না করা পর্যন্ত খাদ্যশষ্য ব্যবহার করে না। প্রথমে খাদ্য শষ্য তারা সালজং দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে থাকেন। তারপর তারা খাদ্যশষ্য নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। ওয়ানগালার সময় তারা বিভিন্ন ধরনের পিঠা প্রস্তুত করে থাকে এবং চালের মদ প্রস্তুত করে থাকে। উৎসবের সময় তা সবার সাথে সহভাগিতা করা হয়। এ উৎসবের মাধ্যমে তারা সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানায় তাদেরকে খাদ্যশষ্য দানের জন্য। তাদের কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ এবং প্রশংসার ঢালি সৃষ্টি কর্তার নামে সবকিছু করা হয় এই উৎসবে। এখনও এই অনুষ্ঠান খুবই আড়ম্বরে করা হয়।
এই ওয়ানগালা আচারানুষ্ঠান খ্রিস্ট ধর্মের সাথে হুবহু মিলে যায়। খ্রিস্ট ধর্মে খ্রিস্ট রাজার পর্বে এই ওয়ানগালা উৎসব পালন করা হয়। কেননা এই উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য হল ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানো তার সমস্ত দানের জন্য। আমরা জগতে যা কিছু পায় তা সবই ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। ভাল ফসল উপাদনের মূল কারণ হল ঈশ্বর। তাই প্রথম ফসল গোলাঘরে নেয়ার পূর্বে ঈশ্বরকে উসর্গ করা হয়। খ্রিস্ট ধর্মের এই মূল্যবোধ গারো সংস্কৃতিতে খুবই অর্থপূণ।
রোগ নিরাময় পদ্ধতি:
সাংসারেক গারোদের  বিশ্বাস তাদের রোগশোকের প্রধান কারন হল দেবদেবীর ক্রোধ এবং কোন অন্যায় কাজ করে তাদের বিরক্তি করলে। অবশ্য কেউ তা দেখেনি তা তাদের বিশ্বাস এবং কাজ একমাত্র করতে পারে কামাল পুরোহিত। কোন বাড়িতে কোন সদস্য দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ থাকলে এবং ভেষজ ঔষুধ সেবনে সুস্থ না হলে দেবদেবী সন্তুষ্ট বিধানের জন্য পূজার আয়োজন করা হয়। এই ক্রিয়া পরিচালনার জন্য বিজ্ঞ খামালকে ডাকা হয়। কিন্তু অধিকাংশ খামালই নিরক্ষর। তারা এই শক্তি স্বপ্নযোগে পেয়েছে। এই রোগমুক্তির পূজাকে গারো ভাষায় বলা হয় ‘আমুয়া’ সাধারনত সকাল বেলায় শুরু করা হয়। বাড়ির আঙ্গিনায় বিশেষ এক জায়গা পসিষ্কার করে মাটির বেদী তৈরি করা হয়। এই বেদীর চারিদিকে কলা গাছের খুটি পোতা হয়। এই স্থানকে কিমিন্ডা বলা হয়। পূজার শুরুতে কলা পাতা রাখা হয়। কলা পাতার উপরে দেশী কুলা বসানো থাকে। সেই কুলার উপরে চাল রাখা হয়। সাথে একটি ঝুড়ি রাখা হয়। ঝুড়ির চালের উপর একটি ডিম রাখা হয়। সেটির পাশে মুরগির পালক গুজে দেয়া হয়। তাছাড়া আতপ চালের ভাত এবং মাংসের তরকারি কুলার উপরে রাখা হয়। পূজার সময় রোগীকে খামালের পাশেই বসে থাকতে হয়। এ সময় খামাল মন্ত্র পাঠ করতে থাকে এবং রোগমুক্তির র্প্রাথনা করে দেবতার উদ্দেশ্যে।

খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহন করার পর গারো সংস্কৃতিতে এই আচারানুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে এর পরিবর্তে তারা আরো একটি অর্থপূর্ণ রোগনিরাময়ের পদ্ধতি পেয়েছে। তারা রোগিলেপন সংস্কার। যদিও তা মৃত্যু পূর্বমহুর্ত দেয়া হয়। গারোরাও রোগ নিরাময় অনুষ্ঠান মরণাপন্ন রোগীর জন্য এই অনুষ্ঠান করা হত একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুরোহিতের মাধ্যমে। রোগিলেপন অনুষ্ঠানও একজন অভিষিক্ত পুরোহিতের মাধ্যমে দেয়া হয়। যা গারো সংস্কৃতিকে আরো জোড়ালো করেছ।
গারো অঞ্চলে ব্যাপ্টিস্ট মন্ডলী
ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীগণ ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আসার পর ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এই মন্ডলীর অন্যতম প্রচারক রেভারেন্ট রুপার্ট বিয়ন ও তাঁর তিন সঙ্গী বাঙ্গালী প্রচারক গঙ্গাচরণ, তর্কভূষণ ও রামদয়াল ময়মনসিংহ এসে একটি কেন্দ্র স্থাপন করেন। এরপর তাঁরা মান্দি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা সুসং দুর্গাপুরে ধর্ম পচার শুরু করেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তাঁরাই মান্দি আদিবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম তাজপুর মহুরীর অধিবাসী রাধানাথ তজুকে  খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করতে সক্ষম  হন। মান্দি আদিবসীদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম মজবুত করার জন্য বিরিশিরিতে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীগণ একটি মিশন কেন্দ্র স্থাপন করলেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর এই মিশনের উদ্বোধন হয়।
গারো অঞ্চলে কাথলিক মন্ডলী
বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মান্দির খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে  সর্বপ্রথম জানতে পারে ব্যাপ্টিস্ট মন্ডলীর মিশনারীদের কাছ থেকে। তারপর এ্যাংলিকান মিশনারীদের কাছ থেকে। কাথলিক  মন্ডলী সম্পর্কে এই অঞ্চলের লোকেরা কিছুই জানত না। কেননা তখনও কাথলিক মন্ডলী এই এলাকায় আসেনি। কিন্তু এ অঞ্চলে কর্মরত ব্যাপ্টিস্ট মন্ডলীর প্রচারকগণ কাথলিক মন্ডলী বিরুদ্ধে প্রচার করতে গিয়ে কয়েকজন মান্দি শ্রোতাদের মধ্যে কাথলিক মন্ডলী সম্পর্কে জানার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। পরে জয়নাখ চৌধুরির এ্যংলিকান অনুপ্রেরণায় পাঁচজন মান্দিদের মধ্যে কাথলিক মন্ডলী সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরো বাড়ল। তিনি তাদের বলেছিলেন; ‘‘ খ্রিস্টান হতে চাইলে কাথলিক হও।’’ জিরিং হাজং, খদিং হাজং, উজির রুরাম, সিন্ধু রুগা ও থিমান দাংগ সেই আগ্রহী পাচজন মান্দি। তারা জয়নাথের কাছে বিস্তারিত তথ্য জেনে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বিশপ হার্থের সাথে দেখা করতে লক্ষী বাজারে বিশপ ভবনে রওনা দেন।  তারা তাদের উদ্দেশ্য বিশপের কাছে বলেন এবং নিজেদের ব্যাপ্টিস্ট বলে পরিচয় দেন। তারা বিশপকে বলেন, ‘‘ কিছুদিন আগে আমরা শুনেছি যে, কাথলিক ধর্মই খ্রিস্ট ধর্মের আদি ধর্ম। এই ধর্মে প্রকৃত শিক্ষা রয়েছে এবং এরগুরু ঢাকায় আছেন। তাই এই ধর্মের বিষয়ে আমাদেরকে শেখাতে তার ব্যাবস্থা করতে আপনাকে অনুরোধ করতে আমরা আপনার কাছে এসেছি।”  বিশপ হার্থ তাদের আগ্রহ এবং সুদীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করে আসার জন্য তাদের প্রশংসা করেন এবং তাদের আবেদন আপাতত পূরণ করা সম্ভব নয় তা তিনি দুঃখের সাথে জানালেন। তিনি তাদেরকে কয়েকটি ক্যাথিখিসম বই দিলেন। তারা তা নিজের ইচ্ছায় আগ্রহে পাঠ করে প্রার্থনাসহ বিশ্বাস মন্ত্র সব মুখস্থ করে ফেলল। ১৯০৯ খিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর বিশপ লিন্নেবর্ণ যখন ঢাকা ধর্ম প্রদেশের দায়িত্বভার গ্রহন করলেন তখন তার যাজন সংখ্যা ছিল মাত্র পনের জন এবং ধর্ম প্রদেশের দায়িত্ব ছিল ঢাকা, আরাকান, নোয়াখালি, চোট্টগ্রাম, বরিশাল এ অঞ্চল সমূহ। যাজক সংখ্যা কম থাকলেও তিনি ময়মনসিংহ গারো অঞ্চলে যাজক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমত এলাকার বিষয় জানার জন্য ফাদার ফ্লৈরীকে পাচ মান্দি অঞ্চলে সরজমিনে পরিদর্শনে পাঠান। ফাদার রাজার বাড়ীতে গেলে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারী মনে করে তাদের গ্রহন করেনি। পরে ভুল ভাঙ্গলে তাদের সাদরে গ্রহণ করে। পরে তারা জিরিং ও থদিং এর গ্রামে গেলেন। সাংসারেক মান্দিরা তাদের দেকে খুবই খশি হলেন। তিনি তাদের সাথে দশদিন কাটালেন এবং খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষা দিলেন। তিনি যীশুর মূর্তি দেখিয়ে মান্দি সাংসারেকদের বলতেন, “ যীশু সকল মানুষের জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সকলকে কাথলিক ধর্মে আসতে আহŸান করেছেন। পরে তিনি ঢাকায় ফিরে গেলেন এবং বিশপকে গারো অঞ্চলে প্রৈরিতিক কাজে সফরতার সম্ভাবনার কথা জানালেন। তিনি একটি মিশন কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য অনুরোধ করলেন। তার কথা শুনে বিশপ মান্দি অঞ্চলে মিশনারী পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম কাথলিক  মিশনারী ফাদার এডলফ ফ্রান্সিস এবং তিমথি মান্দি অঞ্চলে রাণীখংয়ের থাউশালপাড়ায় আসেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ১৯ মার্চ তিনি ২১ জন পুরুষ ও মহিলা মান্দিদের দীক্ষা দিলেন। জিরিং হাজং এর জমিতে শন ও বাশ দিয়ে গীর্জা ঘর নিমার্ণ করেন। ফাদার ফ্রান্সিস নানা বাধা থাকা সত্তে¡ও দুই বছরে চারশত মান্দিদের খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন।
খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহন করার পর মান্দি সংস্কৃতি
মান্দিরা খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহন করার  তাদের সংস্কৃতিতে কিছুতা পরিবর্তন হলেও  তা আধুনিকতার তাল মিলিয়ে চলার জন্য খুবই যথাপোযুগী। তাদের কাছে খ্রিস্ট বাণী খুব সহজেই প্রচার করা হয়েছে কেননা তাদের সংস্কৃতিকে  খ্রিস্ট ধর্মে সহজে  গ্রহণ করা হয়েছে এবং খ্রিস্ট ধর্ম  উপযোগিতা । খ্রিস্ট ধর্ম উন্মুক্ত। তাই সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। এমনকি নিজের ভাষায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা যায় এবং ঈশ্বরকে নাম ধরে ডাকা যায় তাই সহজে তারা  খ্রিস্ট ধর্মকে গ্রহণ করে। বর্তমান আধুনিক  যুগে সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে এবং সংস্কৃতিকে খুবই প্রভাব পড়ছে। তাই সংস্কৃতি ধরে রাখতে খ্রিস্ট ধর্ম  ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমি মনে করি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পর তাদের  গারো সংস্কৃতিতে সংস্কার এসেছে। ধর্মীয় রীতি অনুসারে কিছু কিছু  সাংস্কৃতিক দিক পরিবর্তন হয়েছে  এবং সম্পুর্ণ খ্রিস্টিয় মূল্যবোধে জীবন ধারণ করছে যেমন, মৃত ব্যাক্তিকে কবর দেয়া, খ্রিস্টিয় সামাজিক মূল্যবোধ, বিয়ের রীতি খ্রিস্ট ধর্ম পদ্ধতিতে, ঈশ্বরকে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে উপাসনা করা, ইত্যাদি। খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পর তারা খুব দ্রুত শিক্ষিত হয়েছে। তারা নিজের সংস্কৃতির মূূল্য বুঝতে শিখেছে, সম্পদ সংরক্ষন করছে এবং অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। আমি মনে করি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ  না করলে তাদের সংস্কৃতি বিলিন হয়ে যেত। তাদের সংস্কৃতি খ্রিস্ট ধর্মে  মিশে আছে। মিশনালরীদের প্রচেষ্টায় ফলে মান্দি ভাষা রোমান হরফে আজ এক লিখিত ভাষায় উন্নতি হল। এ ভাষায় এখন পবিত্র বাইবেল অনুবাদসহ বিভিন্ন  বিষয়ে লেখা বই পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের গারোরা ৯৯% খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। তাদের ভালবাসা, ¯েœহ, আদর ও যতেœ গারোরা সহজে  খিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। তারা তাঁদের কাছ থেকে অনেক উপকার পেয়েছে।
মান্দি সাংস্কৃতিক জীবনে খ্রিস্ট ধর্ম
বাংলাদেশের মান্দি সমাজের জন্য এত সংখ্যক পাইমারি ও হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার তুলনায়  হিন্দু মুসলমান অঞ্চলে নাই। অনেক স্কুল  থাকাতে মান্দি সমাজের ৬০-৭০% জনই লিখতে  পড়তে পারে এবং অনেকেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যাদলয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ পাচ্ছে। খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করার ফলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বিজাতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হওয়ার পরও এদেশে বৃহত্তর  জনগোষ্ঠী ও সরকারের নানা সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক শোষনের শিকার হয়েছিল তা স্বত্তে¡ও তারা ঠিকে আছে এবং নতুনভাবে গড়ে ওঠার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। খ্রিস্ট ধর্ম  গ্রহণ করায় মান্দিরা খ্রিস্টিয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের পরিপন্থী বিষয়গুলো ছাড়া তাদের কৃষ্টি, ভাষা ও ঐতিহ্য সবই বহাল আছে। খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার ফলে তাদের ভাষা এখন প্রতিষ্ঠিত।  প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ কাথলিক  ধর্মপদেশ প্রতিষ্ঠা এ  অঞ্চলে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী মান্দিদের জন্য সুস্থিরতা প্রতিষ্ঠা করেছে। ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশে বর্তমানে কাথলিক সংখ্যা ৮০,০০০ উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে থেকে পুরোহিত, সিস্টার এবং একজন বিশপ আছেন।  বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা আছে। এসবই খ্রিস্টকে গ্রহণ করার ফলে। সুতরাং বলা যায় যে খ্রিস্ট ধর্ম মান্দি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
বিবাহ পদ্ধতি গারো সংস্কৃতিতে
গারোদের বিবাহ  পদ্ধতি সম্পুর্ণ অসহবর্ণ। স্বামী-স্ত্রী পরস্পপর অবশ্যই পৃথক গোষ্ঠির হতে হবে। একই গোত্রের মধ্যে কখনো বিবাহ স্মপন্ন হতে পারে না। তাদের মাঝে এমন  ব্যাতিক্রম হলেও তাদেরকে সমাজে গ্রহণ করা হয় না। তাদেরকে সমাজের ঘৃণার পাত্র হতে হবে। তাদের মধ্যে এরুপ বিবাহ অনাচারের সমতুল্য।  অতিতে গারোদের বিবাহ সম্পাদনে সংস্কৃতির তৎপরতা এক বিরাট ভূমিকা পালন করত। গারোদের সর্ববৃহৎ উৎসব ওয়ান গালা গারো তরুণ-তরুণীদের মন দেয়া নেয়া এবং পস্পপরকে জানা-চেনার এক বিশেষ সুযোগ। সাধারণত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান হয়। তাদের মধ্যে এমন নিয়ম ছিল যে ছেলেদের জোড় করে  ধরে বিয়ে দিত তাদের অনিচ্ছা স্বতেও। ছেলে মেয়ে এক ঘরে রাত্রে থাকতে হত।  সকালে ছেলে যদি না পালিয়ে যায় তাহলে বুঝতে  হবে ছেলে মেয়েকে পছন্দ করেছে। তাদের অভিভাব পরে তাদের বিয়ের ব্যাবস্থা করবে। এ বিয়ে সম্পন্ন হবে খামালের মাধ্যমে।
খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পরে এরুপ বিয়ে আর প্রচলিত হয় না। এখন সব বিয়েই খ্রিস্ট ধর্ম রীতি অনুসারে করা হয়। তবে এর মধ্যে তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি এখনও ধরে রেখেছে।
গারো সমাজে কয়েকটি বিয়ের পদ্ধতি ও খ্রিস্ট ধর্ম:
থুনাপ্্আ ( ছেলে-মেয়ের সম্পতিতে বিয়ে)
এ ক্ষেতে ছেলে মেয়ে একসাথে বসবাস করতে থাকে স্বামী স্ত্রী হিসাবে। এ বিয়ের পদ্ধতি লিভিং টুগেদার বলা যায়। পরে তা সমাজের  কাছে জানাজানি হয়ে গেলে বিয়ের ব্যাবস্থা করে অভিভাবকবৃন্দ। আগে সাংসারেক পদ্ধতিতে বিয়ের ব্যাবস্থা করা হত। তবে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করায় এরুপ বিয়ে হয় তবে খ্রিস্ট ধর্ম রীতিতে হয় তাকে বর্তমানে সংশোধনের বিয়ে বলা হয়। পুরোহিত  এ বিয়ে সম্পাদন করে   থাকেন।
চাসেংআ (অপেক্ষারত অবস্থান)
এ পদ্ধতিতে বয়স্কা মেয়ে তার ইস্পিত ছেলের বাবার বাড়িতে অবস্থান করবে এবং বিভিন্নভাবে ছেলেকে প্রলুপদ্ধ করবে। ছেলে যদি তার প্রলোভনে বা প্রেমে পড়ে তাহলে অভিভাবক তাদের বিয়ের ব্যাবস্থা করবে। সাধারনত এ রীতি মামার ছেলের সাথে হয়ে থাকে। তবে এরুপ বিয়ে এখন খুবই কম।
দকচাপ্আ (পুণরায় স্ত্রী বা স্বামী প্রদান)
কোন প্রবীণ স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে স্বামীর গোত্র থেকে বিয়ে ব্যাবস্থা করা বা স্ত্রী মারা গেলে স্ত্রীর গোত্র থেকে বিয়ের ব্যাবস্থা করা তবে তা ব্যাক্তির অনুমতি ক্রমে হবে। তা দ্বিতীয় স্বামী বা স্ত্রী হিসাবে তাকে গ্রহণ করবে। এ বিয়ে এখনও প্রচলিত আছে বা ঐতিহ্য আছে। তবে অনেকে  নাচক করে দেয়।  পরবর্তিতে তাদের পছন্দ মত বিয়ে করে। তবে ধর্মীয় রীতি অনুসারে বিয়ে হয়ে থাকে। তা না  হলে সে সমাজের ঘৃণার পাত্র হবে। খ্রিষ্টিয় ধর্ম রীতিতে না থাকলেও তা পুরোহিতের অনুমতিতে বিবেচনায় রাখা হয়। তবে তা খ্রিস্টিয় ধর্ম রীতিতে বিয়ে হবে।
জিকগিত্তে রাআ (সহযোগী স্ত্রী)
কোন কারন বশত স্ত্রী যদি পঙ্গু বা সন্তান ধারণে অক্ষম হয় তাহলে স্ত্রীর অনুমতিক্রমে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে তবে তা হবে স্ত্রীর গোত্র হতে। যদি তা না হয় তাহলে দ্বিতীয় স্ত্রী সকল প্রকার সম্পতি হতে বঞ্চিত হবে। তবে এরুপ বিয়ে এখন দেখা যায়না। কেননা বর্তমানে অনেক মান্দি পরিবার শিক্ষিত এবং ধর্মীয় রীতিতে তা স্বীকৃত নয়। তবে সমাজে কয়েকটি ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
নকপান্তে গাআ (যুব গৃহে প্রবেশ)
এ বিয়ে পদ্ধতি মেয়ে যাকে বিয়ে করতে চায় রাতে যুব গৃহে অবস্থান করবে কিন্তু তা একজন প্রবীণা বিশ্বস্তার সাহায্যে গোপনে সেখানে গমন করবে।  এ অবস্থায় ছেলে যদি রাজি হয় তবে তা জনসমক্ষে তা প্রকাশ করা হবে। তারপর অভিভাবকবৃন্দ বিয়ের ব্যাবস্থা করবে। তবে শিক্ষিত ও খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পর এরুপ বিয়ের ব্যাবস্থা আর দেখা যায় না। বর্তমানে সব ধরনের বিয়ে খ্রিস্ট ধর্ম রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হযে  থাকে। আর যদি তা না হয় তাহলে তা সমাজে স্বীকৃত নয়।
উপসংহার:
গারো আদিবাসীদের নিজস্ব অমূল্য কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আছে। এই সংস্কৃতির মধ্যে দিয়েই তারা নিজেদের পরিচয় দেয়। খ্রিস্ট ধর্ম  গ্রহন করার পর তারা খ্রিস্টান নামে পরিচিত লাভ করেছে। সুতরাং তারা খ্রিস্টান এবং গারো আদিবাসী। তাদের সংস্কৃতি এবং ধর্ম তাদেরকে বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে উপযোগী করছে।  তারা খ্রিস্টকে গ্রহন না করলে হয়ত তারা এখনও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারত না। তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধওে  রাখতে খ্রিস্ট ধর্ম বিপুল ভুমিকা পালন করছে। গারো সমাজে  এবং তাদের সংস্কৃতিতে খ্রিস্ট ধর্মের প্রভাব দেখা যায়।

জীবনবৃদান্ত:
১.      চেীধুরী, শ্রীভুপেন্দ্রনাথ এম. এ: ‘গারো সংস্কৃতির কয়েকটি দিক’। অনুবাদক সুভাষ জেংচাম, ঢাকা।
২.     সাত্তার, আব্দুস: ‘গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’। বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৭।
৩.     মারাক, মনীন্দ্রনাথ: ‘গারো কৃষ্টি ও সংস্কৃতি’। বাংলাদেশের মঙ্গলীয় আদিবাসী, সম্পাদনায় মুস্তফা কামাল, ২০০৫।
৪.     কস্তা, গিলিও: ‘গারো আইন’। অনুবাদক সুভাষ জেংচাম, ১৯৮৫।
৫.     জেংচাম, সুভাষ: ‘গারো সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়’। গারো অঞ্চলে খ্রীষ্ট ধর্মের আগমন  এবং অবদান, সম্পাদনা রেভা. ফা. পিটার রেমা অনান্য, ২০১০, পৃষ্টা ১১-৭৯।
৬.     মারাক, রেভা. মনীন্দ্রনাথ: ‘গারো অঞ্চলে ব্যাপ্টিস্ট মন্ডলীর সংক্ষিপ্ত  ইতিহাস এবং বিরিশিরি মিশন’। ওনরফ, পৃষ্টা ১৩৪-১৫৮।
৭.     রেমা, ফা. পিটার: ‘গারো অঞ্চলে কাথলিক মন্ডলীর ইতিহাস’। ওনরফ, পৃষ্টা ১৬৮-১৭৬।

Culture

Parable of the Forgiving Father

Works of Mercy

MESSAGE OF HIS HOLINESS POPE FRANCIS FOR THE WORLD DAY OF MIGRANTS AND REFUGEES (2014)