বৈরাগ্য

 

বৈরাগ্য

বৈরাগ্য একটি প্রচীন কৃচ্ছসাধনা। প্রত্যেক ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাগণ বৈরাগ্য সাধনা করেছেন। বৈরাগ্য সাধনা করে তারা ঈশ^রের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। সাধারণ অর্থে বৈরাগ্য হল সংসারের প্রতি বিরাগ। সংসার ত্যাগ করে ঈশ^রের সর্বদা ভজনা করে। বৈরাগ্য সংসারের প্রতি উদাসীন কিন্তু ঈশ^রের প্রতি অনুরাগ। ঈশ^রানুরাগ ব্যাতিত প্রকৃত বৈরাগ্য সাধনা হয় না।  সংসার বিষয় ছেড়ে দিয়ে উদাসীন জীবন যাপন করা যায় কিন্তু প্রকৃত বৈরাগ্য হয় না। বৈরাগ্য অর্থ শুধু গেরুয়া পোশাকে সাধু সন্নাসী  হওয়া নয়। তবে ধর্মাচারণের জন্য বৈরাগ্য অত্যাবশ্যক। বৈরাগ্য সাধনায় জগতের সকল বিষয় বৈরাগীর বশীভূত হবে কিন্তু বিষয়ের বশীভূত হবে না। বৈরাগ্য সাধনা ঈশ^র সানিধ্য লাভের একটা উপায়।

বৈরাগ্য

বৈরাগ্য সংসারে প্রতি উদাসীনতা এবং সংসারের অনাসক্তি। বৈরাগ্য হল উদসাসীনতা, বিষয়ভোগ এবং সংসার বীতস্পৃহা। বৈরাগ্য বলতে কি বুঝায় সে কথা বলতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন যে, “কেবলমাত্র জগতের বিষয় থেকে মনটি তুলে নেওয়াই বৈরাগ্য নয়, সেই সঙ্গে ঈশ^রের প্রতি অনুরাগ থাকলে তবেই তা বৈরাগ্য।”


 বৈরাগ্য শব্দের অর্থ কেবল সাধু সন্ন্যাসী হওয়া নয়। ধর্মাচার্েযণর জন্যে বৈরাগ্য এক অত্যাবশ্যক বিষয়। বৈরাগ্য শব্দটি সংস্কৃত ধাতু ‘বি’- রণ্জ’+ ‘ঘঞ’ প্রত্যয় করে পাই ‘বিরাগ’ যার ভাববাচক বিশেষ্য হচ্ছে বৈরাগ্য। রণজ ধাতুর ধাতুর অর্থ রঙ লাগানো। বৈরাগ্য শব্দের অর্থ জাগতিক বিষয়ের প্রতি কিছুতেই আসক্তি না হওয়া। পৃথিবীর সবকিছুই মনের বিষয়। যদি নির্জনে বনে জঙ্গলে যাওয়া হয়, সেখানেও দেহ রযেছে, মন আছে সেগুলোও মনের বিষয়। সব কিছু ছেড়ে দিলে মানুষ মারা যাবে। বৈরাগ্য প্রকৃত অর্থ হল পার্থিব বস্তুর মধ্যে থাকবে কিন্তু কোন বিষয়ের রঙে নিজের মনকে কখনো রঞ্জিত হতে দেবে না। জাগতিক বিষয় বস্তুর প্রতি প্রভাবিত হবে না। জগতের সকল বিষয় বশীভূত থাকবে, কিন্তু বিষয়ের বশীভূত হবে না। এটাই প্রকৃত বৈরাগ্য।  


তীব্র বৈরাগ্য


 তীব্র বৈরাগ্য সর্বদা ভগবানের জন্য ব্যকুল। তীব্র বৈরাগ্য ভগবান ভিন্ন আর কিছু চায় না। বৈরাগ্য পলায়নের মনেবৃক্তি নয়, রৈরাগ্য অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া। সৎ কর্ম যে করে না, সে অসৎ কর্ম করে না। বিষয়কে বর্জন করে, অবিষয়কে নিয়ে মগ্ন থাকতে হবে। অবিষয় হল পরমপুরুষ। তিনি নিত্য, সৎ। সৎ এর বাহ্যিক প্রকাশই সত্য। তই বলা হয় সত্যে নাস্তি ভয়ং কস্য চিৎ। সত্যকে যে আশ্রয় করে আছে, পরম পুরুষের কাছে আশ্রয় নিয়েছে তার কোন ভয় নেই। আনন্দ স্বরুপ ব্রহ্মকে যে পেয়েছে তার কোন ভয় নাই। ভক্তি রাজ্যে ত্যাগ বৈরাগ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈরাগ্য কতগুলি জড় জাগতিক বিষয়ভোগ ত্যাগ পূর্বক আসে না, সেটা আসে ভগবান ভক্তি থেকে। শুদ্ধ বৈরাগ্য ভগবানের সন্ধান করে।


 বদ্ধজীবন


বদ্ধজীব হল সংসার জগতের বিষয় নিয়ে জীবন যাপন করা। সংসারের মধ্যেই ঈশ^রের উপস্থিতি উপলব্ধি করা। সংসার জীবেিন এত দুঃখ-কষ্ট-বেদনা তুবুও চৈতন্য হয় না। জগতের বিষয়ের মধ্যেই  বদ্ধ থাকে। বদ্ধ জীবের লক্ষণ হল সংসার থেকে ভাল জায়গায় রাখলে সে ধীরে ধীরে মারা যাবে। স্বামী বিবেক আনন্দ বদ্ধজীব সর্ম্পকে একটি উদাহরণ দেন  “ উট কাঁটা ঘাস  বড় ভালবাসে। কিন্তু যত খায় মুখ দিয়ে রক্ত ততই রক্ত পড়ে, তবুও সেই কাঁটা ঘাসই খাবে, ছাড়বে না। সংসারী লোক এত শোক তাপ পায় তবুও কিছুদিনের পর যেমন তেমনি। ”

বৈরাগ্য চার প্রকার ক. বিদ্বৎ বৈরাগ্য খ. বিবিদিষা বৈরাগ্য গ. মর্কট বৈরাগ্য ঘ. আতুর বৈরাগ্য

ক. বিদ্বৎ বৈরাগ্য: ঠিক ঠিক বৈরাগ্য হলো ও তখনি সন্ন্যাস নিয়ে বেরিয়ে পড়ল এটি প্রাগজন্ম বা পূর্ব জন্মের সংস্কার না থাকলে হয় না। তার নাম বিদ্বৎ বৈরাগী।


খ.  বিবিদিষা বৈরাগ্য:  আত্মতত্ত¡ জানবার প্রবল বাসনা থেকে শাস্ত্রপাঠ ও সাধনাদি দ্বারা স্ব-স্বরুপ অবগত ইবার জন্য কোন ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের কাছে সন্ন্যাস নিয়ে স্বাধ্যায় ও সাধন ভজন করতে লাগল একে বিবিদিষা বৈরাগ্য বলে।

গ.  মর্কট বৈরাগ: সংসারের তারড়নায় স্বজন বিয়োগ বা অন্য কারণে কেউ কেউ বেরিয়ে পড়ে সন্ন্যাস নেয়, কিন্তু এ বৈরাগ্যের স্থায়ী হয় না, এর নাম মর্কট বৈরাগী। সংসারের জ¦ালায়  জ¦লে গেরুয়া পোশাক পড়েছে, এ বৈরাগ্য বেশীদিন ঠিকেনা।  কর্ম নাই কাশী চলে গেল।  

ঘ. আতুর বৈরাগ্য: আর এক প্রকার বৈরাগী আছে যেমন মুমূর্ষূ রোগশয্যায় শায়িত, বাঁচবার আশা নেই, তখন তাকে সন্ন্যাস দিবার বিধি আছে। যে যদি মরে তো পবিত্র সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করে মরে গেল- পরজন্মে এই পুণ্যে ভাল জন্ম হবে। আর যদি বেঁচে যায় তো আর গৃহে না গিয়ে ব্রহ্মজ্ঞান লাভের চেষ্টায় সন্ন্যাসী হয়ে কালযাপন করবে। একে আতুর সন্ন্যাস বলে।

অনুরাগ ও বৈরাগ্য

 বৈরাগ্য মানে ব্যাকুলতা। বৈরাগ্যে ঈশ^রের অনুরাগ, বিষয়ে বিরাগ। ঈশ^র লাভ করতে হলে দুটো জিনিস থাকা চাই বৈরাগ্য এবং অনুরাগ। বাহ্যিক বৈরাগ্যে ঈশ^স সন্ধান করা যায় না। অনুরাগটা হল অন্তরের; বৈরাগ্য অন্তরের হলেও কিছুটা বহিঃপ্রকাশ। বাহ্যিক বৈরাগ্য অনেক মানুষের মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু ঈশ^রানুরাগ দেখা যায় না। বৈরাগ্য নির্ভর করে অনুরাগের উপর। অনুরাগ না থাকলে বৈরাগ্য টিকবে না। সংসারে অনাস্কত, বিষয় বাসনামুক্ত থাকাই সঠিক বৈরাগ্য।


ভোগের প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। আকর্ষণ বা বিষয়াসক্তির শক্তির সাথে ঈশ^রাভিমুখী মনের বিষম বিরোধ। সুতরাং যে মন ঈশ^রকে লাভ করতে চাই মনকে যেকোন বিষয়ে উদাসীন থাকতে হয়। মানুষ বিষয় বৈরাগ্য গ্রহণ করতে পারে কিন্তু ঈশ^রপ্রীতি নাই তা বৈরাগ্য নয়। মন ঈশ^রাভিমূখী হলেও বিষয় সম্পর্কে তার উদাসীনতা নেই তবে তা সম্পূর্ণ তদগতচিত্ত  হতে পারেনি। অনুরাগ ও বৈরাগ্য একসাথে অগ্রসর হতে হবে। একটি ইতিবাচক অপরটি নেতিবাচক । ইতিবাচক এই অর্থে যে চিত্তপ্রবাহ একাগ্র লক্ষ্যে একমাত্র ঈশ^রের দিকে ধাবিত হবে একং ঈশ^রের থেকে মনকে বিক্ষিপ্ত করে এমন যে কোন বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত হতে হবে। সুতরাং ঈশ^রানুরাগ এবং ঈশ^রে অনন্যচেতা হওয়া। এ দুটির একত্রে সমাবেশ হলেই প্রকৃত বৈরাগ্য। বিষয় ত্যাগ করলেই বৈরাগ্য হয় না। ঈশ^রের ভালবাসার মধ্যেমে ত্যাগ ও অনুরাগের একত্রে সমাবেশ হলেই বৈরাগ্য হয়।  একটিকেও বাদ দেওয়া যায় না। বিষয় বাসনা ত্যাগ না হলে অনুরাগ আসেনা, আর অনুরাগ না হলে ত্যাগ অর্থহীন। ঈশ^র উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন অনন্য চিন্তা। গীতায় বলা হয়েছে যে নিরন্তর অনন্যচিত্ত হয়ে যে ভক্ত ভগবানকে চিন্তা করেন, ভজনা করেন, নিত্য  যুক্ত থাকে, ভগবান স্বয়ং তাকে বহন করেন। ভক্তের সকল ভার ভগবান গ্রহণ করেন।

ভক্তের বৈরাগ্য

ভক্তের বৈরাগ্য হৃদয়ে প্রবেশ করে, অনান্য আসক্তি সেখানে স্থান হয় না।  ঈশ^রের প্রেমসমুদ্রের জলে ভক্তি ভক্তের হৃদয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়। সেখানে ছোটখাটো প্রেমের  আর স্থান থাকে না। এটাই ভক্তের বৈরাগ্য বা ত্যাগ।  ভগবান ভিন্ন ভক্তের অন্য বিষয়ে যে বৈরাগ্য, তা ভগবানের প্রতি পরম অনুরাগ হতে উৎপন্ন।  এ বৈরাগ্য লাভ করলে পরাভক্তির উচ্চতম শিখরে উঠবার দ্বার খলে দেয়। পরম ভক্তি লাভের জন্য তা অব্যশক। ভক্তের ঈশ^র ছাড়া কোন বিষয়ে আসক্তি থাকে না। ঈশ^রই একমাত্র বিষয়।

বাসনা ত্যাগ

যতক্ষণ পর্যন্ত বাসনা থাকে ততক্ষণ  পর্যন্ত কর্ম থাকে অর্থাৎ চিন্তা, ভাবনা, অশান্তি। বৈরাগীর বাসনা ত্যাগ করা আবশ্যক। বাসনা ত্যাগ হলেই কর্মক্ষয় হয় এবং শান্তি হয়। বৈরাগী নিষ্কাম কর্ম করে। নিষ্কাম কমে শান্তি আসে।  তবে নিষ্কাম কর্ম কঠিন। প্রবল সাধনা ফলে নিষ্কাম কর্ম সম্ভব। বৈরাগ্য সাধনাই সকল বাসনা ত্যাগ করা চাই। তা না হলে প্রকৃত বৈরাগ্য সাধনা হয় না।

বৈরাগী সঞ্চয় করবে না- প্রেম হলে কর্মত্যাগ হয়

মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে কিন্তু নিজে ভোগ করতে পারে না। সুতরাং বৈরাগী সঞ্চয় করতে নেই। সাধু বৈরাগীরা সম্পূর্ণ ঈশ^রের উপর র্নিভর করবে। তাই বৈরাগ্য সাধকের গেরুয়া পোশাক ছাঢ়া কিছই থাকে না। তাদের সঞ্চয় বিষয় বাসনা ত্যাগ করে  ঈশ^র সাধনা করা। ঈশ^র প্রেম হলেই কর্ম ত্যাগ হয়।

বৈরাগী ভাব: আধ্যাত্মিক জ্ঞান উদয় হওয়ার পা সংসার ও সংসারের বিষয়রাশি ভোগের প্রতি যে বীতস্পৃহা বা অনাসক্তি অনুভূত হয় তাই বৈরাগী ভাব।

সমাধি পাদ

বিষয়  বাসনাদ্বয়কে ত্যাগ করিবার শক্তি। মনে কর আমি একটি পদ দিয়ে যাচ্ছি, একজন লোক এসে আমার ঘড়িটি নিয়ে গেল। তা আমার ক্রোধে পরিণত হল। এই ভাব নিবারণ নিবারণ করতে পারাই বৈরাগ্য। সংসারী লোক বিষয়ভোগই জীবনের চরম লক্ষ্য। এ বৈরাগ্য সাধনা ভয়ানক প্রলোভন। তা অস্বীকার করা এবং ঐগুলি দিয়ে মনকে বৃক্তির আকারে পরিণত হতে না দেওয়াই বৈরাগ্য। স্বানুভূত ও পরানুভূত বিষয় হতে যে দুই ধরণের কার্য প্রবৃত্তি জন্মায়, সেগুলো দমন করা ও   এই রুপ চিত্তকে তাদের বশীভূত হতে না দেওয়াকে বৈরাগ্য বলে। প্রবৃত্তি যেন আয়ত্তে থাকে, আমি যেন তার আয়ত্তাধীণ না হই এই প্রকার মানসিক শক্তিকে বৈরাগ্য বলে। এই বৈরাগ্যই মুক্তির একমাত্র উপায়।


সুতারয় বৈরাগ্য সাধনায় আমাদের গুণের আসক্তিকে পরিত্যাগ করায়, তখন তা শক্তির উচ্চতম বিকাশ বলা যায়। বৈরাগ্য সাধনাই বৈরাগ্য লাভ হলে বিষয় ও গুণগুলি পর্যন্ত বীতরাগ হই ও তা পরিত্যাগ করি। বৈরাগ্য সাধনা জগতের বিষয় ত্যাগ করে ঈশ^রেরই সাধনা করে। ঈশ^রের প্রতি আসক্তি সংসারের প্রতি অনাসক্তিই বৈরাগ্য। জগৎ সংসারে থেকে জগতের বিষয় ত্যাগ করে ঈশ^রের অনুরাগই বৈরাগী।


সহায়কগ্রন্থ সমূহ:  


১. স্বামী শান্তরুপানন্দ; শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দের উপদেশাবলী, কলকাতা, মুমুক্ষানন্দ, কলকাতা, ১৯৮৮।


২. শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, শ্রীম কথিত, ১ম ভাগ  ও ৩য় ভাগ , কলকাতা, ১৩৮৬।


৩. লালন অধ্যাত্মিক অভিধান; ২য় খন্ড, বলন কাঁইজি সম্পাদনায় , সমাচার, ঢাকা-১১০০।


৪. স্বামী বৈকুন্ঠানন্দ; কুইজ অন্ কথামৃত: মুমুক্ষানন্দ, কলকাতা, ২০০৯।


 

Culture

Parable of the Forgiving Father

Christianity in Garo Culture

Works of Mercy

MESSAGE OF HIS HOLINESS POPE FRANCIS FOR THE WORLD DAY OF MIGRANTS AND REFUGEES (2014)