বাংলাদেশে মঙ্গরবাণী ঘোষণায় নিবেদিত অবলেট সংঘ
বাংলাদেশে মঙ্গলবাণী ঘোষণায় নিবেদিত অবলেট সংঘ
ফাঃ অজিত ভিক্টর কস্তা, ও.এম. আই
প্রাক্-কথনঃজানুয়ারী ২৫, ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে সাধু ইউজিন ডি মাজেনড ফ্রান্স দেশের এক্র-এন-প্রোভান্সে “অবলেটস্ অফ মেরী ইম্মাকুলেট সংঘ” প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রায় ৪০০০ অবলেট ফাদার ও ব্রাদারগণ পৃথিবীর ৭০ টি দেশে মঙ্গলবাণী ঘোষণা ও মন্ডলীতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও এশিয়ায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী, সংস্কৃতি, মতবাদ, বিশ^াস ও ধর্মের জনগোষ্ঠীকে তাঁরা পালকীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে অবলেটদের আগমনঃ ঈশ^রের সেবক স্বর্গীয় আর্চবিশপ অমল থিওটনিয়াস অমল গাঙ্গুলী, সি.এস.সি এর আমন্ত্রনে ২৯ শে জুলাই ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে অবলেট ফাদারদের একটি দল বাংলাদেশে প্রেরণ সেবার জন্য আগমন করেন। ভিসাজনিত কারণে তাঁরা একসাথে নয় বরং বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে এসেছিল। প্রথম দলে যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন: ফাঃ গিলেস্ গতিয়ের, ফাঃ কার্ল কেলী, ফাঃ পল হাউয়ার্ড, ফাঃ পিলিপ দিসানাইকা, ফাঃ ডরিনেল্লা, ফাঃ জেরী অরসিনো, ফাঃ মাইকেল লেপ্রিস, ফাঃ মার্চেলিয়ান ও ফাঃ হেনরী ভেনহুপ। দলটি বিভিন্ন দেশের অবলেটদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। আগমনের উদ্দেশ্য সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ গঠনে ব্রতী হওয়া, স্থানীয় মন্ডলীর ভিত্ রচনা ও সুদূঢ় করা, মঙ্গলবাণী ঘোষণায় নিবেদিত হওয়া, পালকয়ি সেবা দান করা এবং স্থানীয় যাজক গঠনে সাহাষ্য-সহযোগীতা দান করা। দেশের তৎকালীন কঠিন বাস্তবতা ও স্বাস্থ্যগতকারণে কতিপয় অবলেট কয়েক বছর সেবা দেওয়ার পর তাঁরা নিজ দেশে ফিরে যান। শেষাবধি শুধু ফাঃ হেনরী বেনহুপ একা রয়ে যান। পরবর্তীতে তাঁর সাথে যোগ দেন ফাঃ সার্ভে, ফাঃ জেরার্ড, ফাঃ এঞ্জেলো ও ফাঃ এমিল। এভাবেই অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অবলেটগণ বাংলাদেশ মন্ডলীতে একটা ভিত রচনা করতে সক্ষম হন। এ যাত্রা আরও গতি পায় ফাঃ মনোহর কোড়াইয়া ও ফাঃ হেনরী রিবেরুর অভিষেকের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে ৩২ অবলেট, তাঁদের মধ্যে একজন আর্চ বিবপশ বিজয় ডি’ক্রুশ, ও.এম.আই, ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ, বাংলাদেশ মন্ডলীতে ও ফাঃ অরুন বোজারিও, মিশনারী হিসাবে রোম নগরীতে অবস্থানরত জেনারেল হাউজে এবং ফাঃ শীতল নকরেক ও ফাঃ সবুজ সিমসাং, দক্ষিণ কোরিয়াতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
অবলেট ক্যারিজমঃ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সাধু ইউজিনের ক্যারিজমকে হৃদয়ে ধারণ করে অবলেটগণ সারা পৃবিথীতে ঐশরাজ্য প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা, বিশ^স্থতা ও নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অবলেট ক্যারিজমগুলো হলোঃ ১) ক্রুশবিদ্ধ যীশুর প্রতি মরমী প্রেম, ২) মÐলীকে নিবিড়ভাবে ভালবাসা, ৩) সংঘবদ্ধ জীবন চর্চা, ৪) মা মারীয়ার প্রতি গভীর ভালবাসা, এবং ৫) যে সকল দুর্গম, বিধ্বস্ত, অবহেলিত, কষ্টকর, অনুন্নত জনপদ ও প্রান্তিকজনের কাছে মঙ্গলবাণী পৌঁছায়নি-সেখানে মঙ্গলবাণী ঘোষণা করা। এ সাহসী ও প্রত্যয়দীপ্ত সেবার জন্য পুণ্য পিতা ১১তম পিউস, “অবলেটদেরকে কঠিন মিশন কাজের দক্ষ কারিগর ও শিল্পী হিসাবে অভিহিত করেছেন”। সাধু জন পল, সাধু ইউজিনকে “নবযুগের অগ্র পথিক বা মানব” হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ পবিত্র আত্মার অনুপ্রাণনে তিনি যুগলক্ষণকে চিহিৃত করতে পেরেছিলেন এবং ঐশ বা মুক্তিপরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে মÐলীকে সর্বান্তকরণে সহায়তা দান করেছেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠাতার ন্যায় অবলেটগণও “নবযুগের অগ্র পথিক বা মানব” রূপে মানুষের মুক্তির জন্য সর্বদা সচেষ্ট ও সচেতন।
বাংলাদেশে পালকীয় সেবায় অবলেটগণঃঢাকা ও চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশ, সিলেট ও রাজশাহী ধর্মপ্রদেশে অবলেট ফাদারগণ ধর্মপ্রদেশের ধর্মপাল, ধর্মপ্রদেশীয় যাজক ও অন্যান্য সন্যাস ব্রতীদের সাথে একাত্ম হয়ে মাÐলীতে পালকীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সেবার ক্ষেত্র সমূহঃ ১) সকল প্রান্তিকজন-যাঁদের মানবীয় ও ঐশ মর্যাদা ধুলায় লুন্ঠিত, তাঁদেরকে মঙ্গলবাণী শোনানো ও তাঁদের সার্বিক মুক্তির জন্য কাজ করা, ২) স্থানীয় মÐলীতে ঐশরাজ্য বিস্তারে ও প্রতিষ্ঠায় অংশী হওয়া। ধর্মপ্রদেশের ধর্মপল্লীগুলোতে সাক্রামেন্তীয় ও আত্মিক-সেবা দান করা, ৩) শিক্ষা সেবা, মানবিক-সামাজিক-আর্থিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করা। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণ, লালন-পালন ও বিকাশ সাধনে সহায়তা দান করা, ৪) ন্যায্যতা-শান্তি এবং বিশ্বসৃষ্টির যত্ম নেওয়ার কাজে অংশগ্রহণ করা, ৫) স্থানীয় মÐলীতে প্রভুর দ্রাক্ষাক্ষেত্রে কর্মী প্রক্ষিণ ও গঠন ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, ৬) শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী-যুবক-যবতী গঠন করা ও যত্ম নেওয়া, ৭) পরামর্ম সেবাদান, ব্রতধারী ও ব্রতধারিনীদের আত্মিক যত্ম নেওয়া, এবং ৮) বাংলাদেশ বিশপ সম্মিলনীর কতিপয় কমিশনে সেবা দান করা।
বর্তমানে পালকীয় সেবাদান স্থানসমূহঃ সিলেট ধর্মপ্রদেশে-মুগাইপাড়, বড়লেখা, খাদিম ও লক্ষীপুর ধর্মপল্লীতে, রাজশাহী ধর্মপ্রদেশে কাটাডাঙ্গা ও গোপালপুর ধর্মপল্লী, চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশে আলিকদম ও লামা ধর্মপল্লীতে এবং ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশে বারিধারাতে পালকীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া সেন্ট ইউজিন বিদ্যালয় (ঢাকা), সেন্ট ইউজিন বিদ্যালয় (খাদিমনগর), সাধু জন পল উচ্চ বিদ্যালয় (ডিমাই)এবং নির্মলা মারীয়া উচ্চ বিদ্যালয় (কুলাউড়া) পরিচালনা করছেন। অবলেট জুনিওরেট এবং সাধু ইউজিন নামে তাঁদের দু’টি গঠন গৃহ রয়েছে ঢাকাতে।
ভবিষৎ স্বপ্নঃবর্তমানে অবলেটগণ মÐীতে যে সেবাসমূহ দান করে যাচ্ছেন, ভবিষতেও তা অব্যাহত রাখার জন্য দূড় প্রতিজ্ঞ। সেইসাথে অন্যান্য ধর্মপ্রদেশের তাঁদের সেবার পরিধি বাড়ানোর স্বপ্ন আছে। তাছাড়া বিদেশেও মিশনারী প্রেরণ অব্যাহত বাখা। আদীবাসী জনগোষ্ঠী ও চা বাগানের মানুসের সার্বিক মুক্তির জন্য আরও জোরালোভাবে কাজ করা। শিক্ষা-সামাজিক-মানবিক-সাংস্কৃতিক ও আর্থিক সেবাসসূহের পরিধি আরও বাড়ানোর প্রতি নজর দেওয়া। সর্বোপরি, বাংলাদেশ মÐলীকে আরও সুদূঢ়করণে ধর্মপালদের সাথে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সার্বিক মুক্তির জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করতে দূঢ় প্রতিজ্ঞ।