করোনা ও অর্থনৈতিক ভাবনা
করোনা ও অর্থনৈতিক ভাবনা
ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন!
আমি সবসময় এই কথাটা বিশ্বাস করি ও যত যাই হোক না কেন তা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। বড় কোনো শোকে বা কষ্টে হয়তো সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না কিন্তু পরবর্তীতে বুঝা যায় আসলে তাঁর পরিকল্পনা কি?
আমাদের সবার দিনকাল মোটামুটি ভালোই চলছিলো।হঠাৎ করোনা মহামারী আসায় যেন আমাদের সবার জীবন উলট পালট করে দিলো।অনিশ্চিত হয়ে গেল আমাদের চলমান জীবন ধারা।আমরা বুঝতেও পারিনি এতটা করুন পরিস্থিতি হবে আমাদের।
শত শত বছরের কর্মস্থল ও আবাসস্থল ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হল আমাদের ৮০% মানুষকে।এত বছরেও আমরা মান্দিরা ঢাকায় টিকে থাকার মত সক্ষমতা অর্জন করে উঠতে পারিনি। যার দরুন করোনাতে আমরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছি।
চাকরী হারিয়েছি অনেকেই। বিকল্প কর্ম পরিকল্পনা ও বাড়তি কোনো আয়ের উৎস না থাকায় পড়তে হয়েছে বিপাকে।চরম পরিস্থতির মধ্য দিয়ে আমরা করোনাকালীন ২টা বছর পাড় করলাম।
করোনা আমাদের কতটুকু শিক্ষা দিয়েছে সেটা বলতে পারবোনা।কিন্তু চারপাশে তাকালে বুঝা যায় করোনা কিছুটা হলেও আমাদের জন্যে ভালো কিছু নিয়ে এসেছে।
করোনা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে সঞ্চয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। বুঝিয়ে দিয়েছে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বাঁচার তাগিদ।আমাদেরকে এক হওয়ার জন্যে শিক্ষা দিয়েছে।আপন কে পর কে তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
একতাবদ্ধ না থাকার কারণে গার্মেন্টস ও পার্লারে কর্মরত শত শত কর্মী কর্মহীন হয়েছে। এত বছরেও নিজেদের কোনো সংগঠন না থাকায় নিজেদের এই চরম সংকটে নিজেরা নিজেদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি।পারেনি উপরমহলের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে।আসলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে কিছু করা সম্ভব নয় সবাই একটা বডি দেখতে চাই যার মাধ্যমে সরাসরি কিছু করা যায় ও দেওয়া যায়।সেই বডিটাই আমাদের মান্দি মালিক ও শ্রমিকদের নেই। যার কারণে দক্ষতা থাকা সত্বেও চাকরী হারানো। মালিকরা সুযোগ পেয়ে বলেছে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
অর্থাৎ কোম্পানি যখন নিজেই বিপাকে পড়েছে তখন নিজের কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাদের চাকরীচ্যুত করে নিজের স্বার্থের কথা ভেবেছে।অন্যদিকে কর্মীদের চরম আর্থিক ও মানসিক দুর্ভোগে ফেলে নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়েছে এই দুঃসময়ে।
করোনার এই কঠিন সময়ে অনলাইন প্লাটফর্মে মাতগ্রিক(মান্দি উদ্যোক্তা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মিলনমেলা) আমাদের সমাজ ও জাতির জন্যে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখিয়েছে।
দেখিয়েছে দুঃসময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর দুঃসাহসিকতা।
মাতগ্রিক অর্থ যোদ্ধা। বাংলাদেশী গারোদের এটাই প্রথম অনলাইন ভিত্তিক বিজনেস প্লাটফর্ম ও সংগঠন। সংগঠন করার একটাই কারণ নিজেদের অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়াবার উদ্দেশ্য নিয়ে। উদ্যোক্তাদের নিজের কথা বলবার ও শুনবার একটা জায়গা থাকা দরকার আর তা হোক মাতগ্রিক।
করোনাতে যখন দেখা গেছে অনেকেই চাকরী হারিয়ে দিশেহারা তখন মাতগ্রিকের কার্যক্রম দেখে অনেকেই নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করেছে।এক এক করে ৫০-৬০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছে মাতগ্রিকে নিজেদের তৈরী সেবাপণ্য ও বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে।যাদের চাকরী ছিল তারাও চাকরীর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে নেমেছে। মাতগ্রিক মূলত গড়ে উঠেছে নিজেরা নিজেদের পাশে থাকবো এই ভাবনা থেকে। তাই তো মাতগ্রিকের উদ্যোক্তার যখন তাদের কার্যক্রম শুরু করল তখন সকলে মিলে নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা থেকে শুরু বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ও এখনও সাপোর্ট করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।আর এটাই হয়তো করোনা আমাদের বুঝিয়েছে নিজেদের পাশে নিজেদেরই দাঁড়াতে হয় নয়তো পিছিয়ে পরতে হয়।পিছিয়ে পড়া মানুষদের উঠে দাঁড়ানোর জন্যে চাই আর্থিক ও মানসিক সাপোর্ট। আর এই সাপোর্টের কারণেই আজ অনেকেই উঠে দাঁড়িয়েছে। অনেকের নিজস্ব একটা পরিচয় হচ্ছে যা সত্যি আনন্দের। চাকরীর চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরা নিজেদের জন্যে কিছু করছে।
আমাদের মান্দিরা অনেকেই কেবল মাত্র চাকরীর উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবীকা নির্বাহ করতো ও কেউ কেউ একজনের আয়ের উপর নির্ভর করে চলতো।এর দরুণ করোনাতে চাকরী হারিয়ে বুঝতে বাকি নেই যে কেবল মাত্র চাকরীর উপর ও একজনের আয়ের উপর নির্ভর করে চলা মুশকিল।
এখন ফেইসবুক খুললেই আমরা দেখতে পাই আমাদের মান্দিরা নিজেদের ওয়ালে পর্যন্ত বিজনেস রিলেটেড পোস্ট করছে।ছাত্রছাত্রীরাও পড়াশুনার পাশাপাশি নিজেদের মত করে ছোট আকারে হলেও ব্যবসায়ে নেমেছে। চাকরীজীবীরাও পিছিয়ে নেই।তারাও অফিসের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের জন্যে কিছু করবে বলে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে।
গ্রামের পতিত জমিগুলোতে নেমেছে যুবারা।পড়াশুনা শেষ মানেই কেবল চাকরীর পিছনে ছুটা নয় এই বিশ্বাসে তারাও নেমেছে নিজেদের জমিতে।ফলছে নানান ফসল ও গড়ছে নানান ক্ষেত খামার।
গ্রামের বাড়িগুলোতে বেড়েছে হাঁস-মুরগি,গরু-ছাগল ও মৎস্য পালন।
বেড়েছে আবাদি ফসল।আর সেইসব জিনিস নিজেরাই অফলাইন ও অনলাইনে সরাসরি সেল করে হচ্ছে লাভবান।
আমাদের আদিকালের মুরুব্বিদের মধ্যে যে ভুল ধারণা "ব্যবসা মান্দিদের জন্যে নয়" সেটা অনেকটাই পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে সামাজিক প্রেক্ষাপট ও চিন্তাধারা।
এখন অনেকেই ব্যবসাকে সাধুবাদ জানাচ্ছে।
তাছাড়া প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের ব্যবসায়ে নামতে হবে। আমাদের মধ্যে উদ্যোক্তা তৈরী করতে হবে।উদ্যোক্তা তৈরী না হলে আমরা নিজেরা নিজেদের প্রয়োজনে কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারবো না।নিজেদের জন্যে কর্মসংস্থান তৈরী করতে পারবো না।শিক্ষা,মেধা ও দক্ষতা থাকা সত্বেও আমরা দিনশেষে অন্যের অধীনে রয়ে যাবো ও দিনশেষে প্রয়োজন ফুরালে কোম্পানিগুলো আমাদের ডাস্টবিনের মত ছুঁড়ে ফেলে দিবে।
আমাদের মধ্যে অনেক মেধাবী তরুণেরা আছে যারা চাইলেই সমাজের জন্যে অনেক কিছু করতে পারে।তবে তরুণেরা চাইলেই হবে না আমাদের অভিভাবকদেরও সাপোর্ট করা খুবই দরকার। কেউ আর্টিস্ট হতে চাই কিন্তু পরিবারের চাপে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। অথচ আমরা কারোর ছবি আঁকা দেখলে বলি ওয়াও, চমৎকার হয়েছে।এই চমৎকার শব্দটা যদি আমাদের ছেলেমেয়েদের বেলায় বলা যেতো তাহলে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।
ছোট বেলায় যখন শিক্ষকরা জিজ্ঞেস করতেন জীবনের লক্ষ কী? তখন অনেকেই বলতো ফাদার হবে,সিস্টার হবে নয়তো শিক্ষক, ডাক্তার।
আসলে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা যা দেখে বড় হয় তাই হতে চাই আর সমাজে যাদের আমরা খুব সম্মান করি ও যাদের জন্যে চেয়ার টেনে দেই তাদেরই অনুসরণ করার চেষ্টা করি ঐ বয়সে।
আমাদের সমাজে বড় বড় ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তা থাকলে হয়তো তারা তাই হতে চাইতো।চাইতো একটা স্বাধীন পেশা সাথে নিজেই নিজের বস হওয়ার স্বপ্ন সেই সাথে নিজের ও আরও অনেকের জন্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতো।
প্রতিবছর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আমাদের তরুণেরা বেকার ও দুঃখী জীবন যাপন করছে।জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে অনেকে বেঁচে নিচ্ছে মাদক আর মৃত্যু।
তাই আমাদের অভিভাবকদের উচিত ছেলেমেয়েদের টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত করার পিছনে টাকা খরচ না করে ও উৎসাহ না দিয়ে তাদের সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং নিজের ইচ্ছামত স্বাধীন পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া। নয়তো তারা অনেক অর্থের মালিক হবে কিন্তু সুখী হতে পারবে না। আর অসুখী মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা ও অন্যের জন্যে কিছু করার ইচ্ছা জাগে না।
অন্যদিকে তরুণদের বলতে চাই পড়াশুনা মানেই চাকরী নয় জীবনে চাকরী করা থেকেও অনেক কিছু করার আছে। জীবন অনেক বড়। তাছাড়া মানুষ হিসেবে আমরা একেকজন একেক রকম সেটা হোক চেহারা, মেধা,দক্ষতা ও শিক্ষা এবং স্বপ্ন। কেউ ক্যাডার,ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার,উকিল, পুলিশ,নার্স,শিক্ষক,লেখক,সাংবাদিক হবে কেউ হবে আর্টিস্ট,সিঙ্গার,ডান্সার,উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।
নিজের যা হতে মন চাই তাই হওয়া উচিত।কারণ জীবন একটাই। আর এই জীবনটাকে নিজের ও সমাজের জন্যে সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যেতে হবে।
EGo থেকে E বাদ দিয়ে শুধুমাত্র Go টা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করতে হবে।আর যদি E টা নিতে চাই তাহলে ভাবতে হবে E-commerce Go.
ঘরে বসেই আমরা এই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি।
তাই হতাশায় নিমজ্জিত যুবাদের বলতে চাই,সময় হয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর। আমাদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো ইতিবাচকরূপে পরিবর্তন আনার। নতুন কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে বা শুরু করতে গেলে অনেক বাঁধা আসবে,পাছে লোকে কিছু বলবে।কিন্তু সেটা সাময়িক।সবসময় চিন্তা করতে হবে মরা কুকুরকে কেউ লাথি মারে না।অর্থাৎ তুমি যখন গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করবে তখন অনেক কথাই শুনতে হবে।আর এগুলোকে সমালোচনা না ভেবে সম- আলোচনা মনে করে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে হবে ও সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তবে আমরা যাই করিনা কেন তা যেন সমাজের জন্যে ও জাতির জন্যে হয় মঙ্গলজনক।সবার জন্যে রইলো শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
ধন্যবাদ।